শমশের গাজী ও জগন্নাথ সোনাপুর কেল্লা।

 শমশের গাজী ও জগন্নাথ সোনাপুর কেল্লা।

শেখ মনোহর রচিত শমশের গাজীর জীবনী নিয়ে পুঁথি।


ফেনী তথা বৃহত্তর ত্রিপুরা, নোয়াখালীর ইতিহাসে এক কিংবদন্তিতূল্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন শমশের গাজী(১৭০৫-১৭৫৩)। জীবদ্দশায় শূন্য অবস্থা থেকে হয়েছিলেন ফেনী নদীর উত্তর তীরবর্তী স্থান থেকে সিলেটের মনু নদী, মেঘনার পূর্ব তীর ও ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ ভূখন্ডের একচ্ছত্র অধপতি ও ত্রিপুরা বিজয়ী। শমশের গাজীর জীবনের অনেক তথ্যই পাওয়া যায় গাজীনামা পুঁথি থেকে।
"গাজীনামা" গাজীর সভাসদ শেখ মনোহর রচিত তার জীবনীভিত্তিক পুঁথি। শেখ মনোহর ছিলেন জগন্নাথ সোনাপুর নিবাসী, শমশের গাজীর বিশ্বস্ত কর্মচারী, কবি। তিনি শমশের গাজীর পক্ষে ত্রিপুরার রাজধানী উদয়পুর সহ নানা স্থানে শমশের গাজীর প্রতিনিধিত্ব করেন।
গাজীনামা তে নবাবী সনদ লাভ প্রসঙ্গে শেখ মনোহর বলেন-
"শমশের গাজী ছানি নবাব হইল।
পূর্ব্ব বঙ্গ ভাগ্যে এই নতূন ঘটিল।।
......................
.....................
নবাবী সনদ গাজী পাই আনন্দিত।
বাজায় বিজয় বাদ্য মগ্ন মন হরষিত।।
তাহুত পাঠাই দিল নবাব গোচরে।
এক লক্ষ ছত্রিশ হাজার তঙ্কা পরে।।
ছিলট দক্ষিণ কর্ণফুলীর উত্তর।
মেঘনা নদীর পূর্ব্ব যাবদি পাহাড়।।
ইহার উপর গাজী হৈল অধিকারী
ঘোশেছে গাজীর যশ নকিবে হুঙ্কারী।। "
গাজীর শাসনকৃত পরগনা সমূহ হলো- ১. খন্ডল, ২. জগৎপুর, ৩. দক্ষিণ শিক, ৪. আমিরাবাদ, ৫. তীষ্ণা (চৌদ্দগ্রাম অঞ্চল, কুমিল্লা), ৬. খানজাহানগর, ৭. মেহেরকুল (কুমিল্লা ও পাশবর্তী অঞ্চল নিয়ে গঠিত, ১৭৩২ সালে এটি চাকলা রোশনাবাদের অন্তর্ভুক্ত হয়।), ৯. পট্টিকারা বা পাইটকাড়া (চান্দিনা সংলগ্ন অঞ্চল), ১০. বলদাখাল, ১১. কসবা, ১২. নূরনগর (চাকলা রোশনাবাদের সুবৃহৎ পরগণা, কসবা অঞ্চলে অবস্থিত), ১৩. চৌদ্দগ্রাম (বর্তমানে কুমিল্লার একটি উপজেলা), ১৪. গঙ্গামঙ্গল, ১৫. বিশালগড়, ১৬. আটজঙ্গল, ১৭. ভাটিদেশ ও শ্রীহট্ট এবং ১৮. সরাইল (কুমিল্লা জেলার সর্ব উত্তরে অবস্থিত, বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একটি উপজেলা। এছাড়া চাকলা রোশনাবাদের অবশিষ্ট পরগণাসমূহ তার আওতাধীন জমিদারিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীকালে ভুলুয়া ও ইসলামাবাদের (চট্টগ্রাম) নিজামপুর পরগণা শমশের গাজীর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।
এ প্রতাপশালী শাসকের নির্মিত রাজধানী ও কেল্লা ছিলো ছাগলনাইয়ার বর্তমান ভারত সীমান্তবর্তী জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামে উচু পাহাড়ি অঞ্চলে। জমিদার নাছির ও তার ছেলেদের সাথে যুদ্ধে জয়ী হয়ে দক্ষিণ শিকের জমিদারি যখন শমশের গাজী লাভ করেন। তখন সর্বপ্রথম তিনি সকলের সম্মতি আদায় করেন যে, সবাই মিলে তাকে সহযোগিতা করবে। কারণ, তিনি জানতেন ত্রিপুরা রাজের আক্রমণ ছিলো অবশ্যম্ভাবী। কৌশলগত কারণে তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তি, সেনাপতি ও পাড়া-মৌজার সর্দারগণ পরামর্শে বল্লভপুরস্থ জগন্নাথ সোনাপুরে তার কেল্লা ও রাজধানী স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। "গাজীনামা" পুঁথি মতে-
"হল সহস্র ফৌজ গাজীর সঙ্গিতি।
তবে সবে মিলি করলি তারা যুক্তি।।
বল্লভপুর মাঝে এক বাড়ি বানাইল।"

পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা।


শোনা যায় শমশের গাজীর মৃত্যুর পর ত্রিপুরা সৈন্য ও চট্টগ্রামের নবাবী সৈন্যরা (চট্টগ্রামের শাসকদের সাথে তার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিলো) এসে আক্রোশপ্রসূত প্রাসাদ কেল্লাসহ সমস্ত স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়। প্রায় ১ কিমি এলাকা জুড়ে ধ্বংসের চিহ্ন বিদ্যমান ছিলো। ১৯৯৫ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় গাজীর সপ্তম বংশধর মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর আবেদনের প্রেক্ষিতে শমশের গাজীর কেল্লাকে প্রাচীন কীর্তি হিসেবে সংরক্ষণে গেজেট প্রকাশ করলেও, পরবর্তীতে অজ্ঞাত কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়।
দেশভাগের পর সেই রাজধানী শহরের অধিকাংশই ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ভারতীয় অংশে রাস্তা তৈরির সময় ৫০-৬০ বছর আগে গাজীর স্থাপনার স্তুপ ট্রাক ভরে মাসাধিক কাল ধরে সরিয়ে নেওয়া হয় ও তৈরি হয় আমলিঘাট-শ্রীনগর সড়ক। বর্তমানে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া এই কেল্লার বড়ো অংশ জুড়ে বিদ্যমান।
আজ থেকে ত্রিশ/চল্লিশ বছর পূর্বেও এখানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো স্তুপকৃত ইট সুরকি। শমশের গাজীর বংশের লোকেরা ও ইজারাদারগণ বাগান ও বনায়ন করার জন্য ইটের স্তুপ সরিয়ে ফেলে। ফলে মিলিয়ে যায় কেল্লার শেষ নিদর্শন ও ধ্বংসলীলার চিহ্ন।
জগন্নাথ সোনাপুরস্থ সে সকল স্মৃতি চিহ্ন কালের আবর্তে, ইট হনন কারীদের দৌরাত্বে আজ নিশ্চিহ্ন হলেও টিকে আছে টিলার উপরস্থ অদ্ভূত এক দিঘী, স্থানীয় অনেক কিংবদন্তির উৎস এ দিঘীর লোক মুখে পরিচিত নাম একখুইল্যা দিঘী। এ দিঘি নিয়ে গাজীনামার বর্ণনা-
" সম্মুখেতে এক দীঘি বিমুখেতে এক।
অন্দরে খুদিলা কুপ নাহি তার বেক।।
দীর্ঘ পাশ নাহি তার গহিন গম্ভীর।
কুম্ভজার চক্র যের শীতল নীর।।"

মশের গাজীর প্রাসাদ সংলগ্ন পাহাড়ের উপর খনন কৃত গভীর কূপ। যা বর্তমানে এক খুইল্যা/কুইল্যা দিঘী নামে পরিচিত।
মশের গাজীর প্রাসাদ সংলগ্ন পাহাড়ের উপর খনন কৃত গভীর কূপ। যা বর্তমানে এক খুইল্যা/কুইল্যা দিঘী নামে পরিচিত।

জগন্নাথ সোনাপুরস্থ বাড়ির উত্তরে নির্মিত রাজধানী ও কেল্লার পূর্বে-পশ্চিমে ও উত্তর পাশে তিনটা বিশাল আয়তনের দিঘি খনন করেন গাজী। এগুলোর নাম পূর্বে জানা না গেলেও বর্তমানে যথাক্রমে নর্দমা দিঘি, রাঙ্গামাটিয়া দিঘী ও একখুইল্যা দিঘি নামে পরিচিত। পূর্ব পাশের দিঘির পশ্চিম পাড় অত্যন্ত প্রশস্ত (প্রায় একশ ফুট)। এখানে সৈন্যদের শিবির, কাচারি ও অন্যান্য স্থাপনা ছিলো এমন জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে।
পাহাড়ের উপর নির্মিত হয় কেল্লা। পাহাড়ের মাঝখানে খননকৃত দিঘি জনমনে বিস্ময় সৃষ্টি করে। চারিদিকে পাহাড়, মাঝে দিঘি, অতি গভীর স্বচ্ছ পানি টলটল করছে দীর্ঘ আড়াইশো বছর পরেও। এটা কেল্লার সুপেয় পানি ধরে রাখার জন্য পাহাড়ের উপরে চমৎকার এক আধার। দিঘি এখনও অনেক গভীর। এটি বর্তমানে ভারতের অন্তর্ভুক্ত। এই দিঘি নিয়ে রয়েছে নানা কাহিনী, যার কিছু ভীতিকর ও কৌতূহলোদ্দীপক। পশ্চিমে পাহাড়ের নিচে আরেকটি বিশালায়তন দিঘি। লালা মাটির এ দিঘি রাঙ্গামাটিয়া দিঘি নামে পরিচিত।
শমশের গাজীর তৈরী গুহা।


শমশের গাজী তার শাসনামলে প্রজা শাসন ও রাজ্য পরিচালনায় অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দেন। রাজ্যের সুরক্ষা, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, অসহায়-দরিদ্র ও মৌলভি-ব্রাহ্মণদের সাহায্য ও নিষ্কর ভূমি প্রদান, খাজনা মওকুফ, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট, ঈদগাহ, মসজিদ, মন্দির স্থাপন, দিঘি-পুষ্ককরণী খনন, পণ্যদ্রব্য ওজন ও মূল্য নির্ধারন, দুঃসময়ের জন্য খাদ্য মজুদ, চাষাবাদের প্রয়োজনে খাল-নদী কেটে গতিপথ পরিবর্তন, শিক্ষা বিস্তারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন।

এখন অনেকটাই বরাটকৃত নর্দমা দিঘী।

নর্দমা দিঘির পাড়, যেখানে ছিলো সৈন্যদের ব্যারাক, কাচারি, বিদ্যালয়।


শমশের গাজী ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তাঁর প্রশাসনে দেওয়ান-সেনাপতি ও কর্মকর্তারা যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ পেতেন। তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে বাংলার নবাব আলিবর্দী খান তাকে 'ছানি নবাব' উপাধি দিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদগণ তাকে বাংলার বীর, ভাটির বাঘ নামে আখ্যায়িত করেছেন। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফলে ১৭৫৩ সালে তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটে।
আজ বিকলে গিয়েছিলাম জগন্নাথ সোনাপুরস্থ শমসের গাজীর স্মৃতি বিজড়িত স্থানে। দেখে আসলাম একখুইল্যা দিঘি, নর্দমা দিঘি, রাঙ্গামাটিয়া দিঘি(যদিও এটা এখন সমতল জমি), গাজীর নির্মিত সুড়ঙ্গ পথ (মাটির নিচে বিধায়, যা এখনো কিছুটা টিকে আছে)। আগামী কাল যাওয়ার ইচ্ছা আরো কিছু জায়গায়।
২৪/১২/২০২২
তথ্য সূত্রঃ
১. শমশের গাজী- আহমদ মমতাজ।
২. ফেনীর ইতিহাস- জমির আহমেদ।
৩. তিন হাজার বছরের নোয়াখালী- কাজী মোজাম্মেল হক।
৪. চট্টগ্রামের ইতিহাস- ওহীদুল আলম।
৫. বাংলা পিডিয়া।
৬. গাজীনামা- শেখ মনোহর।

Comments

Popular posts from this blog

সিলেটের মরমী সাহিত্য

''আলীবর্দী ও তার সময়'' মূলঃ কালিকিঙ্কর দত্ত, বাংলা অনুবাদঃ আল মারুফ রাসেল