তরফের ইতিহাস

তরফের ইতিহাস

সৈয়দ আবদুল আগফর

প্রথম প্রকাশ: ১২১৪ বঙ্গাব্দ

উৎস সংস্করণ: ২০০৮ খ্রিঃ

 


“তরফের ইতিহাস” বইটা সিলেটের প্রাচীন রাজ্য তরফ নিয়ে লেখা। সৈয়দ আবদুল আগফর রচিত বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১২১৪ বঙ্গাব্দে । এখনো পর্যন্ত তরফ নিয়ে লেখা সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ এটি। নানা কারণে বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। সিলেটের প্রাচীন রাজ্য লাউড়, ইটা, জৈন্তা’র মতো তরফও একটি প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ অঞ্চল। প্রায় ১৩৬ বছর পূর্বে প্রকাশিত এ গ্রন্থের মাধ্যমে তরফের মতো একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের প্রাকৃতিক, কৃষি, বাণিজ্য, শিক্ষা, ধর্ম, আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে জানা জানা যায়। তরফ সম্পর্কে তিনি যখন গ্রন্থটি রচনা করেন তখন পর্যন্ত বাংলা ভাষায় সিলেট সম্পর্কেই কোন ইতিহাস গ্রন্থ রচিত হয়নি। পরবর্তী কালে যারাই সিলেটির ইতিহাস নিয়ে বই লিখেছেন তারা প্রায় সকলেই “তরফের ইতিহাস” বই থেকে কিছু না কিছু সহায়তা পেয়েছেন।  এজন্য সিলেট এবং সিলেটের আঞ্চলিক ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে এ গ্রন্থের গুরুত্ব অপরিসীম।

 


সৈয়দ আবদুল আগফর সাহেব যে তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন বইয়ের ‘উপক্রমণিকা’ পাঠ করলেই বোঝা যায়। ইতিহাস চর্চা ও গুরুত্ব নিয়ে তিনি যে ধারণা উপস্থাপন করেছেন তা বর্তমানকালেও একইভাবে গ্রহনযোগ্য। এক্ষেত্রে কিছু অবাক হতে হয় লেখক ইতিহাস সংরক্ষণ ও চর্চায় যে হতাশ আজ থেকে শত বছর আগে প্রকাশ করেছেন, তা এখনো প্রাসঙ্গিক। এ বইয়ের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক এর ভাষা। পুরনো বাংলায় লেখা হলেও লেখকের ভাষা, শব্দ চয়ন ও বর্ণনা শৈলী সহজ, সরল ও সাবলীল। তাই সহজেই পড়া ও অনুধাবন করা যায়। বইয়ের যেকোন জায়গা থেকে এরকম সাবলীল লেখার উদাহরণ দেয়া যায়। যেমন ২৮ পৃষ্ঠায় লেখক তরফের কৃষি সম্পর্কে বর্ণনা দিচ্ছেন,

 

“ এ স্থানের ভূমি অতিশয় উর্ব্বরা। প্রকৃতি প্রতি বৎসর নুতন নুতন শক্তি প্রদান করিয়া অত্রত্য সকল শস্যশালিনী করিয়া থাকেন। এই স্থানে কৃষি কার্য্যের সম্পূর্ণ উপযোগী। সাধারণতঃ একমাত্র কৃষিকার্য্যই অধিবাসীগণের জীবিকা নির্ব্বাহের প্রধানতম অবলম্বন। দুঃখের বিষয় এই যে, রীতিমত কৃষিকার্য্য শিক্ষার জন্য অধিবাসীগণের যত্ন নাই, সেই পূর্ব্ব পিতামহের সময় হইতে যে প্রণালী চলিয়া আসিতেছে, তাহা হইতে বিশেষ উন্নতি দেখা যায় নাই।” 

 

লেখক যে তার সময়ের তুলনায় এগিয়ে ছিলেন তার আরেকটি প্রমাণ মুসলমান সমাজে নারী শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তার উপলব্ধি। তৎকালীন তরফ বাসীদের ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অনীহাকেও লেখক সমালোচনা করেছেন। তরফের ইতিহাস বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে লেখক তৎতকালীন সময়ের তরফের প্রাকৃতিক অবস্থা, কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা, ধর্ম, সাধারণ মানসিক অবস্থা, আদিম অবস্থা ও সামাজিকতা বিষয়ে আলোচনা। তার আলোচনা অনেকটা নির্মোহ, যার কারণে সে সময়ের একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা যায়। প্রথম অধ্যায়ে তিনি তরফ ও তরফের অন্তর্গত বিভিন্ন স্থানের ইতিহাস সহ কয়েকটি বংশের বিবরণ তুলে ধরেছেন। প্রথম অধ্যায়ে প্রাচীন কাল থেকে আলোচনা শুরু হয়ে সৈয়দ মুসার কাল পর্য়ন্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে তরফের বিভক্তি ও হেদায়েতুল্লাহর এক তরফের মালিক হয়ে ‘তরফদার’ উপাধি লাভ। তৃতীয় অধ্যায়ে সৈয়দ মুহাম্মদ আলাউদ্দিন থেকে ইংরেজ আমল পর্য়ন্ত তরফের শাসকদের বর্ণনা। চতুর্থ অধ্যায়ে তরফের মালিকানা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও মামলার বিবরণ দেয়া হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে সৈয়দ বংশের পতন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে বিভিন্ন গ্রাম (নরপতি, দাউদ নগর, পইল, রামশ্রী) ও পরিবার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

 


তথ্যগত কিছু ভুলভ্রান্তি থাকলেও সিলেট ও সিলেটের আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় “তরফের ইতিহাস” একটি চমৎকার বই। এত কাল আগের একটি বই পাঠের অভিজ্ঞতা সত্যি চমৎকার ছিলো।

 

নতুন ভাবে এ বই প্রকাশ করেছে উৎস প্রকাশন। নতুন সংস্করণে চমৎকার এক ভূমিকা লিখেছেন লেখক ও গবেষক শেখ ফজলে এলাহী।

 

তারিখঃ ৩০/১২/২০২১ খ্রিঃ

 

 


Comments

Popular posts from this blog

সিলেটের মরমী সাহিত্য

শমশের গাজী ও জগন্নাথ সোনাপুর কেল্লা।

''আলীবর্দী ও তার সময়'' মূলঃ কালিকিঙ্কর দত্ত, বাংলা অনুবাদঃ আল মারুফ রাসেল